Pages

Thursday, 28 February 2013

কি যেন এক শূন্যতা




.সকালে
পাতা-ঝরা কুয়াশা-মোড়া সকালের উদাসী ছোঁয়া
নিরানন্দের ঢাকনাহীন আনন্দমুখর প্রাণচঞ্চল মানুষগুলো
গাছে গাছে,ডালে ডালে কাকলির প্রাণমাতানো সুরমুর্ছনা
গাছের পাতায় ঝকঝকে রোদের ঝিলিক
সারা আকাশ জুড়ে তুলোর মত শুভ্র মেঘ
দিকে দিকে প্রসন্ন হাসির নম্র আভা
কিন্তু কি যেন এক শূন্যতা
তুমি নেই বড্ড একা

.অপরাহ্নে
শ্যামল প্রকৃতির সবুজ শোভায় পশ্চিম আকাশ যেন
অপরুপ রূপাঞ্জলিতে ছেয়ে ওঠে।
মনে হয় যেন কোন নিপুন চিত্রকরের
রঙের ভান্ডার উজার করে
পরম যত্নে নরম তুলিতে আঁকা আলপনা।
গাছের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে ঢলে পড়ে
সবুজ মাঠের পূর্ব কোণে
ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে লাল সূর্যের আলোক রেখা
কিন্তু কি যেন এক শূন্যতা
তুমি নেই বড্ড একা

.নিশিতে
সিগ্ধতা আর কোমলতায় ভরা অপৃর্ব এক রাত
দূর থেকে ভেসে আসে শিউলি ফুলের সুবাস
মাঝে মাঝে বয়ে যায় তৃপ্ত কোমল বাতাস
পরিপূর্ণ নিথর রাত্রির শীতল বাতাস মনে আনে প্রশান্তি
ক্রমশ জাগিয়ে তোলে আনন্দ বেদনার সুখ স্মৃতি গুলো
জোছনার পুলকিত রাত্রির মোহিনী রুপ উতালা করে মন
কিন্তু কি যেন এক শূন্যতা
তুমি নেই বড্ড একা


(কবিতাটি হ্যালো -টুডে"র কবিতা বিভাগে প্রকাশিত)

 এছাড়াও কবিতাটি  জলছবি বাতায়নের সাহিত্য সংকলন খোলা জানালা' র ৬৫ পৃষ্ঠায় রয়েছে।



মনে পড়ে তোমার কথা


হৃদয়ের সকল মায়া-মমতা,প্রেম-প্রীতি,দৃষ্টিকে উদার করে
উন্নত মননে আমি-
মনে পড়ে তোমার কথা।
জীবনের সব আবেগ,আনন্দ-বেদনার নিখুঁত অনুভূতিগুলো
আপন বুকে মেখে নিয়ে চির অপেক্ষমান আমি-
মনে পড়ে তোমার কথা।
কর্মক্লান্ত দিনের ব্যস্ততা,কিষ্ট-পীড়িত চিত্তের ক্লান্তি দূর করে
অনাবিল প্রশান্তিতে আমি
মনে পড়ে তোমার কথা।
সত্য ও সুন্দরের সাধনা করে মনের ক্ষুধা মিটিয়ে আমি
যখন মহাসমুদ্রের কল্লোল শুনি,
মনে পড়ে তোমার কথা।
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিপর্যস্ত আমি,
হাবুডুবু খাই হতাশার চোরাবালিতে-তখন
মনে পড়ে তোমার কথা।
যখন আমি জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট,হতাশা-বেদনা ভুলে
অপূর্ণ থাকা দুর্দান্ত ইচ্ছাগুলো পূর্ণ করতে চাই-তখন
মনে পড়ে তোমার কথা।
হতাশা বিজড়িত নিরশাচ্ছন্ন সংসারে মাঝে মাঝে আমি-
তন্দ্রার মধ্যেও জেগে ওঠি,অবসাদের মধ্যেও শান্তি পাই
শুধু তোমারি কথা মনে করে।


কবিতাটি অন্যনিষাদ এর ১১৯তম সংখ্যা ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তে প্রকাশিত

Wednesday, 27 February 2013

আমাদের পণ







সকালে উঠিয়া আমরা মনে মনে বলি,
সারাদিন যেন কোন খারাপ খবর না শুনি।

আমাদের দেশ যারা করে থাকে শাসন,
তারা যেন সে কাজ করে ভালো মনে।

দেশকে তারা যেন খুব ভালবাসে,
হানাহানি মারামারি যেন না থাকে।

শান্তি ও সুখে যেন বাস করতে পারি,
তারা যেন এই দিকে খেয়াল রাখে বেশি।

দুর্নীতি, ঘুষ যেন নাহি থাকে দেশে,
অকল্যাণ থেকে যেন দূরে সবে থাকে।

দেশের সব মানুষ যেন সুখী হয়ে থাকে,
মিথ্যে কথা কভু যেন নাহি কেউ কয়।

হিংসে ঘৃনা থেকে যেন দূরে সরে থাকি,
লেখাপড়া আর কাজে যেন নাহি দিই ফাঁকি।

দুঃখী যেন নাহি হই এই দেশে মোরা,
সর্বদা এই কথা বলি মনে মনে।

Monday, 25 February 2013

একাত্তরের হাতিয়ার


একাত্তরের হাতিয়ার

আত্মপক্ষ
এবনে গোলাম সামাদ
তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

শাহবাগে জনসমাবেশ খুবই উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। প্রথম দিকে এই সমাবেশে দাবি ছিল কেবল, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’ কিন্তু পরে দাবি উঠল ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আর একবার’ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই হাতিয়ার আসবে কোথা থেকে? আর কারাই বা ব্যবহার করবেন এই হাতিয়ার? কারণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধারা এখন আর অনেকেই বেঁচে নেই। তারা ইন্তেকাল করেছেন স্বাভাবিকভাবেই। যেসব মুক্তিযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন, তারা সবাই হয়ে পড়েছেন প্রায় বৃদ্ধ। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সামর্থ্য তাদের আর অবশিষ্ট নেই। অস্ত্র ধারণ করতে হলে নতুন প্রজন্মকে নিতে হবে বিশেষ প্রশিক্ষণ। কিন্তু দেশে বসে সে রকম প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ ঘটবে কি? ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতে যেয়ে। এবারো কি ভারত আসবে তরুণ প্রজন্মকে ১৯৭১-এর মতো প্রশিক্ষণ প্রদান করতে? ১৯৭১-এর যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারত ও পাক বাহিনীর যুদ্ধ। সেটা ঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়ে থাকেনি। বাংলাদেশে এখন আর পাক বাহিনী নেই। বাংলাদেশ এখন একটা পৃথক স্বাধীন দেশ। তার আছে নিজস্ব বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতিয়ার ১৯৭১ সালে গর্জে উঠেছিল পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে। এবার নিশ্চয় গর্জে উঠতে চাইবে না বাংলাদেশ বাহিনীর বিরুদ্ধে। প্রশ্নটা তাই সঙ্গতভাবেই উঠছে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠতে চাইলে বাংলাদেশ বাহিনী সে ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাাখবে।
১৯৭১-এর অবস্থা আর আজকের পরিস্থিতি এক হয়ে নেই। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ বলে কোনো পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। কিন্তু এখন আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার কাদের বিরুদ্ধে, কিভাবে গর্জে উঠবে সেটা নিয়ে থাকছে প্রশ্ন। শাহবাগে সমবেত তরুণ প্রজন্ম কি এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে কিছু ভাবতে চাচ্ছে না! আমরা ১৯৭১ সালের বিশ্বে এখন আর বাস করছি না। নানা দিক থেকেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক আলাদা হয়ে পড়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা চলে, উলফাদের কথা। ১৯৭১-এ উলফা বলে কিছু ছিল না। কিন্তু এখন আছে। ভারত ইচ্ছা করলেই আগের মতো উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বাংলাদেশে সাহায্য পাঠাতে পারবে না। যে সাহায্য সে পাঠাবে, তার একটা অংশ পাচার হয়ে যেতে পারে উত্তর-পূর্ব ভারতে। আর উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামীরা করতে পারেন সেটার ব্যবহার। ভারতকে তাই ভাবতে হবে অনেক ভিন্নভাবে। ভারত ১৯৭১-এ আগরতলা থেকে সৈন্য পাঠিয়েছিল ঢাকার পথে। কিন্তু ত্রিপুরার পরিস্থিতি এখন হয়ে উঠেছে বেশ কিছুটা ভিন্ন। ত্রিপুরীরা চাচ্ছেন স্বাধীন হয়ে যেতে। এই যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, এটাকে বিবেচনায় নিয়ে ভারতকে করতে হবে তার নীতি নির্ধারণ।
বিশুদ্ধ সমরনীতির দিক থেকে বিচার করলেও বলতে হবে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে গুণগতভাবেই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না। পাকিস্তান এখন একটি পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশ। ভারত যদি বাংলাদেশে অভিযান চালাতে চায়, তবে পাকিস্তান কী করবে সেটা এখন খুব নিশ্চিত নয়। ভারত একটা খুবই জনবহুল দেশ। পারমাণবিক যুদ্ধে সে দেশের যত ক্ষতি হবে, পাকিস্তানের তা হবে না। তা ছাড়া ভারতের অর্থনীতি যতটা শিল্পপ্রধান, পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনো ততটা শিল্পপ্রধান নয়। যেকোনো পারমাণবিক যুদ্ধে ভারতের কলকারখানার অর্থনীতি যতটা বিপদগ্রস্ত হবে, পাকিস্তানের অর্থনীতি তা হবে না। পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের তাই থাকবে বেশ কিছু সুবিধা। খবরে প্রকাশ, পাকিস্তান তার গোয়ান্দার বন্দর পরিচালনার ভার প্রদান করতে যাচ্ছে চীনকে। চীন এখানে গড়তে চাচ্ছে এক বিরাট নৌ-ঘাঁটি, যা ভারতের জন্য হয়ে উঠছে খুবই উদ্বেগের কারণ। ভারতের সমুদ্রসৈকত প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটারের কাছাকাছি। এই দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত রক্ষা করার মতো যুদ্ধজাহাজ এখনো ভারতের নেই। ভারত তাই পাকিস্তানে চীনের নৌ-ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনায় হয়ে উঠেছে খুবই উদ্বিগ্ন। ভারত চীনের মতো সমরাস্ত্রে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেনি। ভারতের তাই সমরাস্ত্র কিনতে হচ্ছে বিদেশের কাছ থেকে। এই সমরাস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ঘটছে অনেক দুর্নীতি। যার ফলে সেনাবাহিনীতে ঘটতে পারছে মনমালিন্য। সেনাবাহিনী উঠতে চাচ্ছে বিশৃঙ্খল হয়ে। এ রকম সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করা ভারতের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়তেই পারে।
১৯৭১ সালে ভারতের সেনাবাহিনী যতটা সুশৃঙ্খল ছিল, এখন তা আছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। ভারতের পত্রিকার খবরে প্রকাশ, নকশালরা ব্যবহার করছে স্থল মাইন। এই স্থল মাইন তারা কিনেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে। ভারতের সেনাবাহিনী অস্ত্র বিক্রি করছে নকশালদের কাছে। যেটা ১৯৭১ সালে শোনা যায়নি। ’৭১-এর হাতিয়ার গর্জে উঠার ক্ষেত্রে তাই এখন অনেক বাধার সৃষ্টি হতে পারে। ভারত সেসব বাধাকে সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না। তাই নতুন প্রজন্ম ইচ্ছা করলেই ১৯৭১ সালের মতো কোনো হাতিয়ার গর্জে ওঠার সম্ভাবনা এখন আর বিদ্যমান নেই।
এবার ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী বললেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ছিল আমাদের স্বাধীন হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান আমলেই সাফল্য পেতে পেরেছিল। এর সাথে পরবর্তীকালের ঘটনা প্রবাহকে এক করে দেখা যায় না। ১৯৭১ সালে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা হবে কি হবে না, সেটা নিয়ে। ভাষার বিরোধ এখানে কোনো বিষয় ছিল না। তাই বলা যায় না, ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ। রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনের ইতিহাসকে নানাভাবে বিকৃত করে উত্থাপন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন প্রথম শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। এ সময় শেখ মুজিব এতে কোনো অংশগ্রহণ করেননি। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব ছিলেন জেলে। ইচ্ছা থাকলেও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কোনো অংশ নেয়া। কিন্তু যে কথাটা আজ ভুলে যাওয়া হচ্ছে, তা হলো আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছিল না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ শহরে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় বলেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাতে উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাই আজ যখন শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রভাষার অংশী, তখন সেটাকে ইতিহাসভিত্তিক বলা  চলে না। আর তিনি যখন বলেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পর্ব, সেটাও সমর্থন করা চলে না ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই। ১৯৫২ সালে আমরা বলেছিলাম উর্দু-বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর পাশে বাংলা চাই। এর বেশি আমাদের কোনো দাবি ছিল না সেদিন। আজ বামপন্থীরা দাবি করছেন যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল তাদের দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ইতিহাস কিছু ভিন্ন কথাই বলে। কারণ, পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ছিলেন সাজ্জাদ জাহির। তিনি ছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের লোক। তিনি উত্তর প্রদেশ থেকে হিজরত করেন পশ্চিম পাকিস্তানে। তিনি বলেন, উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অবশ্য তার সাথে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু কমিউনিস্ট নেতা পোষণ করেছিলেন ভিন্নমত। তবে এই উপমহাদেশে কমিউনিস্টরা তখন সাধারণভাবে বলছিলেন-
ইয়ে আজাদী ঝুট্টা হ্যায়
লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।
অর্থাৎ ইংরেজ চলে যাওয়ায় এই উপমহাদেশ স্বাধীন হয়নি। কারণ লাখ লাখ মানুষ এখনো থাকছে অভুক্ত হয়ে।
পূর্ব পাকিস্তানে যখন হচ্ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তখন কিছু বামপন্থীকে বলতে শোনা গিয়েছিল- রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হচ্ছে একটা বুর্জুয়া ব্যাপার। এর সাথে মানুষের ভাত কাপড়ের সমস্যার সংযোগ নেই। আমাদের আন্দোলন করতে হবে জনগণের ভাত কাপড়ের দাবি নিয়ে; ভাষা নিয়ে নয়। ভাষা নিয়ে আন্দোলন কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হতে পারে না। কিন্তু আজ বামপন্থীরা দাবি করছেন, তাদের পূর্বসূরিরা করেছিলেন ভাষা আন্দোলন। কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদী নন। তারা হলেন, শ্রেণী সংগ্রামবাদী। জাতীয়তাবাদ আর শ্রেণী সংগ্রামবাদ পৃথিবীর নানা দেশেই এক হতে পারেনি। গোটা মার্কসবাদে স্থান পেতে পারেনি জাতি সমস্যা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের অনেক কথাই এখন চেপে যাওয়া হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেছিল তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনটি গঠিত হয়েছিল প্রধানত ইসলামপন্থী ছাত্রদের নিয়ে। কিন্তু এখন তাদের কথা বলা হচ্ছে না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এদের কথা চেপে যাওয়া হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। তখন জিন্নাহ সাহেব বেঁচে ছিলেন। জিন্নাহ সাহেব ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনতার উদ্দেশে উর্দুকে কেন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা উচিত, সে সম্পর্কে বক্তৃতা দেন, ইংরেজি ভাষায়। কারণ উর্দু ভাষা তিনি ভালো করে বলতে পারতেন না। এর পর তিনি ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা উচিত বলে যে ভাষণ দেন, তা-ও তিনি দিয়েছিলেন উর্দুতে নয়, ইংরেজি ভাষায়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র তার বক্তৃতার মধ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন। যেসব ছাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের মধ্যে গোলাম আযম ছিলেন একজন। তিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে প্রদান করেন বিশেষ ‘মেমোরেনডাম’ যাতে বলা হয়- কেবল উর্দুকে নয়, বাংলাকেও দিতে হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি। গোলাম আযম এ সময় জামায়াত-ই ইসলামীর সাথে যুক্ত ছিলেন না। ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা ছাত্রনেতা। পরে তিনি চাকরি নিয়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজে যান। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কথা বলার কারণে হারান তার চাকরি। বর্তমানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তার অবদানকেও এখন এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাকে প্রচার করা হচ্ছে কেবলই একজন রাজাকার হিসেবে।
১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, তার বিখ্যাত লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিকে গ্রহণ করে। এই দাবি উত্থাপন করেছিলেন, তখনকার বাংলার বিখ্যাত নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক। ১৯৪১ সালে জনাব সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী গঠন করেন জামায়াত-ই-ইসলামী দল। মওদুদী পাকিস্তান প্রস্তাবকে সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে উপমহাদেশের মুসলমানেরা দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়বে। বিরাট সংখ্যক মুসলমানকে থেকে যেতে হবে ভারতে। তারা যেতে পারবেন না পাকিস্তানে। ভারতীয় মুসলিমদের পড়তে হবে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে। পক্ষান্তরে পাকিস্তান না হলে এই উপমহাদেশের মুসলমানেরা এক হয়ে তাদের দাবিদাবা অনেক সহজেই পূরণ করতে পারবেন। পাকিস্তানের দাবি তাই এই উপমহাদেশের মুসলিম স্বার্থের সমর্থনীয় নয়। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর মওদুদী চলে আসেন পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৭১-এ জামায়াত মনে করে, ভারত চাচ্ছে, পাকিস্তানকে ভেঙে দিতে, যা হবে মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর। জামায়াত তাই গ্রহণ করে সাবেক পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখার নীতি। গোলাম আযম সমর্থন করেন তার দলের এই নীতিকে। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতেন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যথেষ্ট সুবিচার করছে না। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারছে, তা দূর করা প্রয়োজন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাষাসৈনিক ছিলাম না। তবে এই আন্দোলনকে দেখেছি অনেক কাছে থেকে। আর পাঁচজন সাধারণ ছাত্রের মতো বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে দিয়েছি সমর্থন। কিন্তু এই আন্দোলন ঘটেছিল আমার চোখের সম্মুখে। আজ যেভাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে, সেটাকে আমার কাছে মনে হয় যথার্থ নয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, সাবেক পাকিস্তানকে ভেঙে দিয়ে পৃথক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন ছিল না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়েছিল সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে। তার বাইরে নয়। বাংলা ভাষায় যারা কথা বলেন, তাদের শতকরা ৬০ ভাগ বাস করেন বর্তমান বাংলাদেশে। আর বাদবাকি ৪০ ভাগ বাস করেন ভারতে। ভারতের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে ঘটেনি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কোনো আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমিত। আজ পশ্চিম বাংলা থেকে কবীর সুমন এসে শাহবাগ চত্বরে গিটার বাজিয়ে গান করছেন। বলছেন, কোনো দেশের সীমানা তিনি মানেন না। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোক। পশ্চিমবঙ্গ একটি স্বাধীন দেশ নয়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি প্রদেশ মাত্র। বাংলাদেশ যদি পশ্চিম বাংলার সাথে যোগ দেয় তবে বাংলাদেশও হয়ে পড়বে ভারতেরই অঙ্গরাজ্য। তার কোনো স্বাধীন সত্তা বজায় থাকবে না। সুমনের গানের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য খুব বড় রকমের বুদ্ধিমান হওয়ার প্রয়োজন করে না। সুমনের গান করা উচিত পশ্চিমবঙ্গকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য। তারপরে ভেবে দেখা যেতে পারে, দুই বাংলার যৌথ স্বার্থের কথা; তার আগে নয়।

শাহবাগ চত্বর থেকে অনেক কথায় বলা হচ্ছে। যার অর্থ আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন নয়। বলা হচ্ছে, জামায়াতই ইসলামীকে বেআইনি করার কথা। কিন্তু কোনো দলের জনসমর্থন থাকলে তাকে বেআইনি করে খুব একটা ফায়দা হয় না। ভারতে হিন্দু মহাসভাকে বেআইনি করার কথা উঠেছিল। হিন্দু মহাসভা রাতরাতি পরিণত হয় জনসঙ্ঘ নামে একটি দলে। পরে জনসঙ্ঘ আবার পরিণত হয় ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) বিজেপি এখন হয়ে উঠেছে কংগ্রেসের প্রকৃত প্রতিপক্ষ। আগামী নির্বাচনে জিতে সে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতেও পারে। এ যাবত ভারতে যারা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাদের মধ্যে বিজেপির নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী হয়ে আছেন বিশেষভাবে খ্যাত। জামায়াতকে বেআইনি করতে গেলে সে-ও নাম বদলে নতুন দলে পরিণত হতে পারে; যেমন হয়েছে ভারতে হিন্দু মহাসভা দল।
ধর্ম নানা দেশের ইতিহাসকেই প্রভাবিত করেছে এবং করছে। আমাদের বাড়ির কাছে মালয়েশিয়া একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রধর্ম হলো ইসলাম। অনেক দেশেরই রাষ্ট্রধর্ম আছে। রাষ্ট্রধর্ম আছে ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো গণতান্ত্রিক দেশে। এসব দেশের মানুষ ধর্মান্ধ নয়। কিন্তু এদের মধ্যে কাজ করে চলেছে ধর্মীয় মূল্যবোধ। রাষ্ট্রিক আইন গড়ে ওঠে মূল্যবোধের ভিত্তিতে। আর ধর্মবিশ্বাস হলো এখনো মানুষের মূল্যবোধের অন্যতম প্রধান উৎস। শাহবাগে আন্দোলন বিশেষভাবে ধাক্কা খেল ব্লগার রাজিবের কারণে। শাহবাগের আন্দোলন এখন মুসলিম জনসমাজের কাছে মনে হতে পারে একটি ইসলামবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। সব গণতান্ত্রিক দেশেই সংখ্যাগুরু জনসমাজের থাকে একটা বিশেষ ভূমিকা। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। এখানে ইসলামকে খাটো করে আন্দোলন করতে গেলে, তা মানুষকে সাধারণভাবেই ক্ষুব্ধ করে তুলতেই পারে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কী চাচ্ছে, সেটা আমাদের কাছে পরিচ্ছন্ন নয়। তারা বলছে, আলবদর, রাজাকারদের ঠাঁই হবে না বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশে কাদের ঠাঁই হবে, আর কাদের ঠাঁই হবে না, সেটা কি কেবল ঘাদানিকেরাই ঠিক করে দিতে পারবে? তাদের প্রতিপক্ষরা সংখ্যায় খুব কম নয়। তারা বেঁচে নেই ঘাদানিকদের দয়ার ওপর। এটাও উপলদ্ধি করা প্রয়োজন। শাহবাগ চত্বরে প্রচুর শিশুর সমাগম ঘটছে। তারা অনেক কিছুই বলছে। জেনেভা কনভেন অনুসারে শিশুদের যুদ্ধে ব্যবহার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য। শাহবাগ চত্বরে তাই শিশুদের ডেকে এনে তাদের দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা যথাযথ বলে মনে হচ্ছে না। অনেকে বলছেন, শাহবাগের গণজাগরণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করছে। কিন্তু, আমার কাছে মনে হচ্ছে, শাহবাগে যা ঘটছে, তা জাতিকে গুরুতর বিভক্তির দিকেই ঠেলে দিতে পারে। মারদাঙ্গার রাজনীতি আমাদের কাম্য হতে পারে না। কেননা তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিশেষ প্রতিবন্ধক।

www.dailynayadiganta.com

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, 23 February 2013

ঘনায়মান বিজয়



কেটে গিয়েছে সকল আঁধার,
ওঠেছে ভোরের নতুন সূর্য,ফুটেছে আলো।
আঁধারের মোকাবেলায় যেমন আলোর ঝলকানি
তেমনি মিথ্যার মোকাবেলায় হোক সত্যের জয়।

পেরিয়ে সকল বাঁধা গড়ব সুখের নীড়
মিলে মিশে তুমি আমি হয়ে যাব একাকার।

হতে চাই আমি আলোর মিশিলের পথিকৃত
হতে চাই অনন্যমনা,হতে চাই অক্লান্ত কর্মী,
অন্যতম হতে চাই সাধ্যাতীত লাভে।

সুকেশী নবোঢ়া যদি হতে চায় বীরপ্রসূ
দূরদর্শী হয়ে আমি বলতে পারি খুব সহজেই
ঘনায়মান বিজয় হয়ত আর খুব বেশী দূরে নয়।




ঢাকা, রোববার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ
১২ ফাল্গুন ১৪১৯ বঙ্গাব্দ১২ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী

Friday, 8 February 2013

আমাদের অহংকার বাংলা ভাষা

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাঙালি জাতির জীবনে কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ ভাষার এক বেদনাবিধুর ইতিহাস রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বাঙালি ছাড়া আর কোনো ভাষাগোষ্ঠীর জীবনে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়নি। রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়নি। রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে কেবল বাঙালিরাই বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পেরেছে।মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন যাতে তারা একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে পারে। প্রত্যেকটি মানুষকে আল্লাহতায়ালা তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন। আর মাতৃভাষা হচ্ছে তার আবেগ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। বিশ্বময় ভাষার অপরূপ বৈচিত্র্য আল্লাহতায়ালার অপার কুদরতের নিদর্শন। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলা হয়েছে:- ‘আর তার নির্দেশনাবলির মধ্যে রয়েছে মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।’ (সুরা রুম) আমাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য মায়ের ভাষার কোন বিকল্প নেই।মায়ের ভাষার মাধ্যমে মানুষ যত সহজে তার মনের ভাব প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে তা অন্য কোনো ভাষায় সম্ভব নয়।মাতৃভাষার সাথে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সভ্যতা ও সংস্কৃতি জড়িত থাকে। কারন একে অপরের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করা, সৎ ও ন্যায় কাজ করা ,অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা বা বাধা প্রদান করা, ধর্মের বিধিবিধান প্রতিপালন করা, আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু কেবল মাতৃভাষার মাধ্যমেই সম্ভব।রাষ্ট্রীয় ও জীবনের সর্বস্তরে এখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলার অবাধ ব্যবহার আমাদের গৌরবান্বিত করে। আমাদের বাংলা ভাষার সাহিত্য ভান্ডার এখন অনেক উন্নত।স্বাধীনতার পর থেকে মাতৃভাষায় বিভিন্ন বিষয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে। ১৯৫২ সালে যারা বুকের রক্ত দিয়েছিলেন, তাদের স্বপ্ন এখন সার্থকতায় পূর্ণ। বাংলা সাহিত্যচর্চায় এখন সব শ্রেণীর মানুষ নিবেদিতপ্রাণ। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিদ্যা ইত্যাদি এখন মাতৃভাষায় হচ্ছে। অফিস-আদালতেও মাতৃভাষার ব্যবহার এখন স্বতঃস্ফূর্ত। প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন:-“বাহন উপযুক্ত না হলে কেউ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না। লক্ষ্য লাভ করতে গেলে সাহিত্যের বাহন উপযুক্ত হওয়া চাই। সেই বাহন মাতৃভাষা।আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।” সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যচিন্তক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ছিলেন মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ‘বাংলা ভাষা ও মুসলমান সাহিত্য’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে মাতৃভাষা বাংলা সম্পর্কে এক অবিস্মরণীয় বক্তব্য রেখেছেন।তিনি বলেন:-“আমরা বাঙলায় কথাবার্তা কহি, বাঙলায় স্বপ্ন দেখি, বাঙলায় চিন্তা করি, আমাদের প্রাণ বাঙালীর প্রাণ, হাসিকান্না বাঙালীর হাসিকান্না, এমন কি আমাদের রক্তমাংস বাঙালীর রক্তমাংস। অতএব, অপ্রতিরোধীয় রূপে আমাদের মাতৃভাষা¬ যে দেশের মাটিতে আমাদের বাস, যে দেশের বায়ু আমাদের শ্বাস, যে দেশের ফল জলে আমরা পালিত, যে দেশের নদনদীর স্নেহধারায় আমরা পরিপুষ্ট, সেই দেশের ভাষা¬ বাঙলা।” আমাদের প্রিয় ভাষা বাংলা পৃথিবীর একটি অন্যতম সুন্দর ভাষা। বর্তমানে বিশ্বের ২৫ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে।পৃথিবীতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা বিচারে আমাদের স্থান অষ্টম। বাংলা ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষা আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের ১৮৮টি দেশে সগৌরবে উৎযাপিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে।যেটা আমাদের সকলের এক দীপ্ত অহঙ্কার।তাই বাংলা ভাষা আমাদের অহংকারের ভাষা।
বিশিষ্ট সুরকার ও গীতিকার অতুল প্রসাদ সেনের এই গানটি না গাইলে না হয়। আ মরি বাংলা ভাষা মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা ।। মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা ।। আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে ।। গেয়ে গান নাচে বাউল ।। গান গেয়ে ধান কাটে চাষা || আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা।। আছে কৈ এমন ভাষা ।। এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা || আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন : ঐ ফুলেরই মধুর রসে ।। বাঁধলো সুখে মধুর বাসা || আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনলো মালা জগত্ জিনে ।। তোমার চরণ-তীর্থে আজি ।। জগত্ করে যাওয়া-আসা || আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! ঐ ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাকনু মায়ে ‘মা, মা’ ব’লে ।। ঐ ভাষাতেই বলবো হরি, আমি ঐ ভাষাতেই বলবো হরি সাঙ্গ হ’লে কাঁদা হাসা || আ মরি বাংলা ভাষা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! যতদিন সূর্য পুর্বদিকে উঠে পশ্চিমে অস্ত যাবে, মানুষ ততদিন আমাদের সকল ভাষাশহীদদের বুকের আবেগ দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে স্মরণ করবে।আসুন আমরা মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, মায়ের ভাষায় সেবা করার ওয়াদাবদ্ধ হই।মহান আল্লাহ আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে কবুল করুক, আমীন।